সুনামগঞ্জ , শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ , ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
উদ্বোধনেই থমকে আছে সদর হাসপাতালের আইসিইউ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ নরেন্দ্র মোদির শহরে জলাবদ্ধতাসহ নাগরিক দুর্ভোগ নিরসনের দাবি অপরাধমুক্ত সুনামগঞ্জ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জামালগঞ্জে বাঁধ ভেঙে ঢুকছে পানি, প্লাবিত হচ্ছে বসতভিটা, আমন ফসল নিয়ে শঙ্কায় কৃষক জামায়াতে ইসলামী থেকে ‘ইসলামী’ শব্দ বাদ দেওয়ার দাবি যুবদল সভাপতির জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালনে প্রস্তুতিমূলক সভা জেলা পুলিশের অনলাইনভিত্তিক কুইজে প্রথম জেলা ছাত্রদলের সভাপতি পাহাড়ি ঢলে ভেঙেছে আছিয়ার শেষ আশ্রয়, অনিশ্চয়তায় জীবন ছাতক পৌরসভার টেকসই উন্নয়নে আইইউজিআইপি’র সভা জগন্নাথপুর পৌরসভার ২২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার বাজেট ঘোষণা অস্তিত্ব সংকটে পান্ডারখাল বাঁধ ওয়ার্ল্ড ভিশনের শিশুদের বার্ষিক সমাবেশ, ২ হাজার ৭৫০ শিশুর মাঝে উপহার বিতরণ সক্রিয় মাদক কারবারি চক্র মাদক, ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামে দিরাই বিএনপিতে বিরোধ চরমে একপক্ষের বহিষ্কারের সুপারিশ, অপরপক্ষের উন্নয়ন সভার ডাক এক বছরে বিচারাধীন মামলা ২০ লাখে নামিয়ে আনা সম্ভব : আইনমন্ত্রী জামায়াতের এমপির ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ভাইরাল, ফেসবুকে যে ব্যাখ্যা দিলেন চেলা নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন ২৬ জনের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলা ৪৮ পদের মধ্যে ৩৬টিই শূন্য জামালগঞ্জে নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে শতাধিক বসতভিটা

আত্মবিনাশী উন্নয়নে হাওরের সর্বনাশ

  • আপলোড সময় : ২৫-০৫-২০২৬ ১২:৪৪:০০ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৫-০৫-২০২৬ ০১:০২:২৮ পূর্বাহ্ন
আত্মবিনাশী উন্নয়নে হাওরের সর্বনাশ
আজাদুর রহমান চন্দন::>
দেশের মোট চাল উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি (৫৫-৬০ শতাংশ) আসে বোরো মৌসুমে। এর মধ্যে সাতটি হাওরবেষ্টিত জেলায় উৎপাদিত হয় প্রায় ২০ শতাংশ। কিন্তু এবার উৎপাদন মৌসুমে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় কৃষকের আহাজারির শেষ নেই। কারণ, চৈত্র মাসের শেষ দিক থেকে টানা বৃষ্টি আর বৈশাখে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বিস্তীর্ণ জমির আধা পাকা ধান তলিয়ে গেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ হাজার ৭৩ হেক্টর এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে, ৮০ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষতি হয়েছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদন অঞ্চল তথা হাওরাঞ্চলে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গড় হিসাবমতে, প্রতি হেক্টরে প্রায় ৪ দশমিক ৪৭ টন চাল উৎপাদন হওয়ার কথা। সেই হিসাবে ৫০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলে ২ লাখ টনের বেশি উৎপাদন কমে যেতে পারে। আর যদি ৮০ হাজার হেক্টরের হিসাব ধরা হয়, তাহলে ঘাটতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে। যদিও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে ৫০ হাজার হোক আর ৮০ হাজার হেক্টরই হোক, ক্ষতি যা হয়েছে তাতে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত দেশের সাতটি হাওরবেষ্টিত জেলায় প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ৭ মে একটি সংবাদমাধ্যমকে জানান, হাওরাঞ্চলের মোট কৃষিজমির ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার টন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার কৃষক। অপর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, হাওরাঞ্চলের প্রায় ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পুরো হাওরাঞ্চলের প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ এলাকা প্রতিবছরই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। হাওরে ফসলহানি অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। পর পর দুই বছরের বেশি ভালো ফসল সচরাচর পান না হাওরের কৃষক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় ফসল। কিন্তু এবার হয়েছে ব্যতিক্রম। প্রথমে চৈত্র মাসের শেষ দিক থেকে অতিবৃষ্টির কারণে ধান পরিপক্ব হতে সময় বেশি লেগেছে, পরে একপর্যায়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে ফসল নষ্ট হয়েছে, আর শেষ পর্যায়ে পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বেড়ে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে হাওরের ফসল। সিলেট-সুনামগঞ্জ এলাকায় কৃষকের কাছে এবার ‘কাঁচইরা’ তথা কাঁচা বা বৃষ্টি-বাদলের মৌসুম। প্রতি ৫, ১০, ১৫ বা ২০ বছর পর পর এমন সর্বনাশা কাঁচইরা বছর ফিরে আসে। তবে আগে প্রচারের সুযোগ কম থাকায় দেশের মানুষ হাওরে জলাবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হওয়ার কথা তেমন একটা জানতে পারত না। এ বছর সেটা জানতে পারছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রতিটি হাওরকে পুকুর বানিয়ে পানি নিষ্কাশনের পকেট বন্ধ করে দেওয়ায় অতিবৃষ্টির কারণে হাওরে জমা পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। একসময় যেখানে ফসলহানির প্রধান কারণ ছিল বাঁধ ভেঙে যাওয়া, সেখানে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন রকম। বাঁধ থাকলেও ফসল রক্ষা পাচ্ছে না; বরং সেই বাঁধই হয়ে উঠছে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। প্রতিবছর কয়েক লাখ ঘনমিটার মাটির বাঁধ তৈরি বা মেরামত করায় হাওর ও হাওরের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণের আধার বা জলাশয়, হাওরের সঙ্গে যুক্ত নদ-নদী ও খাল ভরাট হয়ে গেছে। গত তিন বছরে ২ হাজার ১৩৬টি ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারে ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ৯৩ লাখ ৬৯ হাজার ঘনমিটার মাটি। এই পরিসংখ্যান সাদাচোখে ইতিবাচক মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। উজানে নদ-নদী খনন না করে এবং হাওরের প্রকৃতি ও পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বিবেচনার বাইরে রেখে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে ভারী বৃষ্টিপাত বা উজানের ঢল নামলেই হাওর হয়ে উঠছে জলাবদ্ধতার ফাঁদ। এবারের মৌসুমে সেটিই স্পষ্ট হয়েছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত বাঁধের প্রভাব। কৃষকেরা শত শত পা¤প বসিয়েও পানি সরাতে ব্যর্থ হয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠসেবা বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হলেও হাওরাঞ্চলে উৎপাদনের ঘনত্ব বেশি। এ কারণে ক্ষতির প্রভাবও তুলনামূলক বেশি। গত মৌসুমে দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এসেছে হাওরবেষ্টিত সাতটি জেলা থেকে। গত বছর বোরো মৌসুমে দেশে প্রায় ২ কোটি ১৩ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছিল। এবার সরকার ২ কোটি ২৪ লাখ টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে। কিন্তু হাওরের এই ধাক্কা সব হিসাব অনিশ্চিত করে তুলেছে। এর আগে, ২০১৭ সালের মার্চ-এপ্রিলের অকালবন্যায় নষ্ট হয়েছিল প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান। সে বছর চালের দাম বেড়েছিল রেকর্ড পরিমাণ। এর পাঁচ বছর পর আঘাত হানে আগাম ঢল, যাতে ক্ষতির মুখে পড়ে ৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান। এতেই চালের বাজার অস্থিতিশীল হয়েছিল। হাওরে সমস্যার শিকড় অবশ্য আরও গভীরে। বাঁধ নির্মাণের জন্য হাওরের ‘জাঙ্গাল’ ও ‘কান্দা’ বা উঁচু জমি কেটে মাটি নেওয়া হচ্ছে। বর্ষায় সেই মাটি ধুয়ে গিয়ে ভরাট করছে খাল, নদী ও জলাশয়। এতে একদিকে যেমন পানি ধারণক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য। অর্থাৎ স্বল্প মেয়াদে সমাধানের জন্য নেওয়া উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে বড় বিপর্যয়ের জন্ম দিচ্ছে। মূলত নীতিগত দুর্বলতার কারণেই এমনটি ঘটছে। কোনো সরকারই হাওর নিয়ে বাস্তবভিত্তিক ও সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনা নেয়নি, নিচ্ছেও না। সরকারের নীতির কারণে প্রকৌশলীদের অস্থায়ী পরিকল্পনা থাকে কেবল বাঁধকেন্দ্রিক। নাগরিকদেরও এ বিষয়ে সচেতনতায় আছে বড় ঘাটতি। এবারের সংকট ঘিরেও দেখা যাচ্ছে ঢাকা থেকে রাজনীতিকেরা এলাকায় গিয়ে ঢালাও বক্তব্য দিচ্ছেন। বরাবরের মতো পাউবোর দুর্নীতির দিকে আঙুল তুলছেন। তাঁদের বক্তব্যে সমস্যার গভীরতা উঠে আসছে না। হাওরাঞ্চলে এবার কৃষকেরা ত্রিমুখী সংকটে পড়েছেন। সেগুলো হলো ধানের উৎপাদন ক্ষতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ধানের বাজারদর কমে যাওয়া। শ্রমিক সংকট পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। এবার ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। হারভেস্টার বা ধান কাটার যন্ত্রের ব্যবহারও জলাবদ্ধতার কারণে সীমিত হয়ে পড়ে। যন্ত্রের ভাড়াও বেড়ে হয়েছে দুই থেকে তিন গুণ। অন্যদিকে, বাজারে ভেজা ধানের দাম কমে গেছে। গত বছর বোরো মৌসুমে ভেজা ধানের দাম ছিল ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা মণ। এবার মণ ৫০০-৬০০ টাকায় নেমেছে। রাজনীতিতে যেমন, উন্নয়ন ও কৃষি উৎপাদনেও তেমনি আত্মবিনাশী পথচলাই যেন আমাদের নিয়তি। হাওরের তো বটেই, সামগ্রিকভাবে দেশের কৃষকেরই মূল সমস্যা কাঠামো ও নীতিগত। এ দেশে কৃষি উৎপাদন অনেক আগেই চলে গেছে ক্রোনি পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থার আওতায়। সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থা আর নয়া-উদারবাদী কৃষি উন্নয়ন নীতি বহাল থাকছে সা¤্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশন-নির্ভর রাষ্ট্রনীতির কারণে। এখানকার কৃষকের আশু দুর্দশাও নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং বিদ্যমান ক্রোনি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক ফল। প্রথমত, দেশের কৃষি এখনো ক্ষুদ্র মালিকানাভিত্তিক ও বাজারনির্ভর। বেশির ভাগ কৃষকের জমি কম, আকারেও খুব ছোট; উৎপাদন খরচ বেশি। কৃষিপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মধ্যস্বত্বভোগী আড়তদার, মিলমালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা। কৃষক উৎপাদন করেন ঠিকই; কিন্তু লাভের বড় অংশ চলে যায় বাণিজ্যিক চেইনের ওপরের স্তরে। এবার যে ধান কৃষক ৫০০-৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, সেই ধান থেকে উৎপাদিত চালই ভোক্তাদের কিনতে হবে গতবারের চেয়ে চড়া দামে। কৃষক সংকটে পড়লেও বিপণন চেইনের শীর্ষ স্তরের ব্যক্তিরা ঠিকই আগের চেয়ে বেশি মুনাফা লুটবেন। সরকার এই মুনাফাচক্র ভাঙার দিকেও নজর দেবে না, হাওরের ফসল রক্ষার সঠিক নীতি প্রণয়নেও মনোযোগী হবে না - এটাই স্বাভাবিক।
[সংকলিত] লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
উদ্বোধনেই থমকে আছে সদর হাসপাতালের আইসিইউ

উদ্বোধনেই থমকে আছে সদর হাসপাতালের আইসিইউ